
অধ্যাপক মােহাম্মদ খালেদের জন্ম ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনাতে । ১৯২২ সালের ৬ জুলাই তিনি জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর শৈশবও কাটে পাটনাতে । তাঁর পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে।তাঁর পিতার নাম আবদুল হাদী , মাতার নাম তামান্না বেগম । আবদুল হাদীর পাঁচ ছেলে – মেয়ের মধ্যে মােহাম্মদ খালেদ সবার বড়।
শিক্ষাজীবন : রাউজানের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান রাউজান আর আর এ সি ইনষ্টিটিউশনে তিনি শিক্ষাজীবন শুরু করেন । উক্ত বিদ্যালয় থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাশ করেন । এরপর তিনি চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন । চট্টগ্রাম কলেজ হতে ১৯৪২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর তিনি কোলকাতা আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে কোলকাতা যান । কিন্তু ভর্তি শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজে বিএ শ্রেণিতে ভর্তি হন । এ সময় তার সাথে শেখ মুজিবর রহমানের ( জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ) পরিচয় ও সখ্যতা গড়ে উঠে । বঙ্গবন্ধুর প্রভাবে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন । এ সময় তাঁর বাবা মারা গেলে বাধ্য হয়ে কোলকাতা ছেড়ে চট্টগ্রাম চলে আসেন । ট্রান্সফার হয়ে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন । সেখান থেকে ১৯৪৪ সালে বি এ পাশ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন । সেখান থেকে এম এ পাশ করে তিনি চট্টগ্রাম চলে আসেন ।
রাজনীতি: কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সংস্পর্শে আসেন । বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রভাবিত হয়ে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন । কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে তিনি ব্রিটিশবিরােধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন । ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মুসলিমলীগ ভেঙে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এই দলের সাথে সম্পৃক্ত হন । মাওলানা ভাষানী , সােহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সারা দেশে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরির উদ্যোগ নিলে অধ্যাপক মােহাম্মদ খালেদ সে উদ্যোগের সাথে যুক্ত হয়ে চট্টগ্রামে সংগঠনের কাজে নেমে পড়েন ।পরবর্তিতে দলটি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে নামের অংশ থেকে মুসলিম বাদ দিয়ে আওয়ামীলীগ নাম ধারণ করে গণমানুষের রাজনীতি শুরু করলে বাঙালিদের মধ্যে নবজাগরণ সৃষ্টি হয় । পরবর্তিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙ্গালির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু হলে তিনি চট্টগ্রামে সে আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে থাকেন । ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী । হিসাবে রাউজান – হাটহাজারী নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তকালিন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পীকার মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীকে পরাজিত করে এমএনএ নির্বাচিত হয়ে সমগ্র পাকিস্তানে আলােড়ন সৃষ্টি করেন । ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনামূলক ঐতিহাসিক ভাষণের পর সমগ্র পূর্ব পাকিস্থানে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হলে চট্টগ্রামে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট যথাক্রমে জহুর আহমদ চৌধুরী , এম.এ. হান্নান , এম.এ. মান্নান , এম.আর সিদ্দিকি ও অধ্যাপক মােহাম্মদ খালেদকে নিয়ে সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয় । তিনি এই কমিটির একজন সদস্য হিসাবে আন্দোলন সগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে মুক্তিযুদ্ধে পরিণত করতে ভূমিকা রাখেন । এ সময় চট্টগ্রামে স্বাধীনবাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায়ও তিনি ভূমিকা রাখেন । ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি প্রবাসি মুজিব নগর সরকারের তথ্যমন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপালন করেন । তিনি মুক্তিযুদ্ধের মুখপত্র হিসাবে প্রকাশিত ‘ জয় বাংলা পত্রিকার সম্পাদক মন্ডলির সদস্য হিসাবে পত্রিকা সম্পাদনায় ভূমিকা রাখেন । ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত ৩২ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির সদস্য হিসাবে সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন । ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের পক্ষে নির্বাচন করে এমপি নির্বাচিত হন । ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার বাকশাল প্রতিষ্ঠিত করলে তিনি বাকশাল চট্টগ্রাম উত্তর জেলার গভর্ণর নির্বাচিত হন ।
কর্মজীবন ও সাংবাদিকতা : কর্মজীবনে তিনি অধ্যাপনা দিয়ে শুরু করলেও ১৯৬০ সালে চট্টগ্রাম থেকে দৈনিক আজাদী প্রকাশিত হলে তিনি তাতে যােগ দিয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন । দৈনিক আজাদীর প্রকাশক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেকের মৃত্যুর পর তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন । মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে দৈনিক আজাদীকে চট্টগ্রামের গণমানুষের পত্রিকায় পরিণত করেন । এছাড়াও তিনি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ।
সমবায় আন্দোলন : স্বাধীন বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু সােনার বাংলা গড়ার ডাক দিলে অধ্যাপক খালেদ উপলব্ধি করেন বঙ্গবন্ধুর সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে সমবায় আন্দোলন গড়ে তােলা দরকার । স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে তিনি । চট্টগ্রাম অঞ্চলে সমবায় আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন ।
মুক্তবুদ্ধিচর্চা : ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত ধার্মিক হলেও আপাদমস্তক তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক । তিনি ছিলেন সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে । মুক্তবুদ্ধিচর্চায় তিনি ছিলেন চট্টগ্রামে প্রতিকৃত । চট্টগ্রাম সহ দেশের যেখানেই মুক্তবুদ্ধিচর্চা ও অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন , সেখানেই ছিল অধ্যাপক খালেদের দৃপ্ত পদচারণা । তিনি চট্টগ্রামের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে দলমত নির্বিশেষে সকলকে এক প্ল্যাটফরমে এনে শত নাগরিক কমিটি গঠন করেন ।
অন্যান্য : তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন । এরমধ্যে চট্টগ্রাম রেডক্রিসেন্ট সােসাইটির সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন । তাঁর নামে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নগরীর জিইসি এলাকায় অধ্যাপক খালেদ চত্বর প্রতিষ্ঠা করে । চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব তাঁর নামে প্রতিবছর স্মারক বক্তৃতার আয়ােজন করে থাকে । চট্টগ্রাম একাডেমী প্রতিবছর অধ্যাপক খালেদ শিশু সাহিত্য পুরস্কার প্রদান , এছাড়া তাঁর নামে ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক ও প্রফেসর মােহাম্মদ খালেদ ফাউন্ডেশন , ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক ও অধ্যাপক মােহাম্মদ খালেদ স্মৃতি পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । বাংলা একাডেমি থেকে তার জীবনী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে । তার প্রকাশিত একমাত্র গ্রন্থ সৌদি আরবে পঁয়ত্রিশ দিন ।
মৃত্যু : ২০০৩ সালের ২১ ডিসেম্বর অধ্যাপক মােহাম্মদ খালেদ ইন্তেকাল করেন ।





